DJI-এর Osmo সিরিজের মতো ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় গিম্বল ক্যামেরা এবং অসংখ্য স্মার্টফোন গিম্বলের এই যুগে, অনার (Honor)-এর ‘রোবট ফোন’ মূলত কোনো আলাদা অ্যাক্সেসরি ছাড়াই স্ট্যাবিলাইজেশন প্রযুক্তিকে ফোনের ভেতরেই যুক্ত করেছে। তাদের এই পরীক্ষামূলক ফ্ল্যাগশিপ ফোনটি সত্যি বলতে রোবটের চেয়ে একটি ‘গিম্বল ফোন’ হিসেবেই বেশি পরিচিত হতে পারে, যদিও সেটি খুব একটা আকর্ষণীয় নাম হতো না।
তাহলে এটি কি অসংখ্য কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের স্বপ্নের জবাব? চলতি বছরের শুরুর দিকে যখন অনার MWC 2026-এ এই ডিভাইসটি উন্মোচন করে, তখন এটি ছিল বার্সেলোনার সেই ট্রেড শো-তে প্রদর্শিত হওয়া সবচাইতে রোমাঞ্চকর একটি ডিভাইস। আন্তর্জাতিকভাবে এটি উন্মোচন করা হলেও, রোবট ফোনটি চীনের বাইরে আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চ হবে না—ডিভাইসটির বিক্রি আপাতত কেবল চীনেই শুরু হয়েছে। স্যামসাং যেভাবে তাদের Galaxy Z TriFold নিয়ে করেছিল, তেমনি অনার (Honor) এখানে সীমিত উৎপাদনের মাধ্যমে বাজারের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। বিষয়টি হতাশাজনক হলেও, বর্তমান অর্থনীতি ও যন্ত্রাংশের ক্রমাগত দাম বাড়ার এই সময়ে তাদের এই সিদ্ধান্ত হয়তো যুক্তিযুক্ত।

এই ডিভাইসের আসল আকর্ষণ এর গিম্বলটি এবং প্রযুক্তিটি অনেকটা ছোট আকারে তৈরি করা হয়েছে তা সত্যিই দেখার মতো। Osmo Pocket কিংবা অন্যান্য স্মার্টফোন গিম্বল হ্যান্ডেলের তুলনায় এই ফোনের পেছনের একটি অতি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের ভেতরে ‘রোবট’ অংশটি ভাঁজ হয়ে সুন্দরভাবে লুকিয়ে থাকে। অনার দাবি করেছে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে ছোট গিম্বল তৈরি করেছে, যা ফোনে ফিট করার জন্য মাত্র ২.৬ গ্রামের নিজস্ব গিম্বল মোটর দিয়ে তৈরি।
এটি ফোনের ভেতরে সুন্দরভাবে ফিট হয়ে গেলেও, রোবট ফোনটিকে পুরোপুরি স্লিম বলা যাবে না—ক্যামেরা ইউনিট ছাড়া ফোনটির থিকনেস বা পুরুত্ব ৯.৬ মিমি।
এই গিম্বল ফোনটিতে ২০০ মেগাপিক্সেলের প্রাইমারি ক্যামেরায় ৩-অ্যাক্সিস স্ট্যাবিলাইজেশন ব্যবহার করা হয়েছে। প্লাস্টিক কাভারের ভেতরে সুরক্ষিতভাবে ভাঁজ করে রাখা অবস্থায় এই একই সেন্সরটি সাধারণ স্মার্টফোন ক্যামেরা হিসেবেও কাজ করে। রেজোলিউশন ছাড়াও এতে রয়েছে f/1.6 অ্যাপারচার এবং সনাতন (বা সাধারণ) অপটিক্যাল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন (OIS)। পাশাপাশি ফোনটিতে রয়েছে OIS সহ একটি ২০০MP টেলিফটো ক্যামেরা (যা ২.৭ গুণ অপটিক্যাল জুম দেয়) এবং ১২২-ডিগ্রি ফিল্ড অব ভিউ সহ একটি ৫০MP আল্ট্রা-ওয়াইড ক্যামেরা।

সামনে একটি ৫০MP ফ্রন্ট ক্যামেরাও রয়েছে, তবে গিম্বল ক্যামেরা থাকতে সেটি ব্যবহারের কী প্রয়োজন? বহু বছর পর একটি প্রধান সেন্সরকে এভাবে মাল্টি-টাস্কিং করতে দেখে বেশ ভালো লাগছে। এখানে সেলফির জন্যও আপনি সম্ভবত সেই গিম্বল ক্যামেরাই ব্যবহার করবেন। আজ থেকে সাত বছর আগের Galaxy A80-এর কথা আমার এখনও মনে আছে, যদিও অন্য কারও মনে আছে কি না সন্দেহ!
গিম্বলটি চালু করতে হলে আপনাকে ম্যানুয়ালি পেছনের কাভারটি সরাতে হবে, তারপর ক্যামেরা বা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাপের ভেতরে থাকা লঞ্চার বাটনে ট্যাপ করতে হবে। এরপরই যান্ত্রিক আর্মটি বের হয়ে আসবে, আর ফোনের ৬.৩১-ইঞ্চির স্ক্রিনের পেছনে কী ঘটছে তা দেখানোর জন্য স্ক্রিনে একটি চমৎকার এক্স-রে গ্রাফিক্যাল অ্যানিমেশন ভেসে উঠবে। যদিও এতে ‘Yoyo’ এআই রোবট অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়েছে, তবে এর বেশিরভাগ ফিচার কেবল চীনেই ঠিকঠাক কাজ করে। তবে তাতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি, কারণ আমার মূল নজর ছিল ফোনের ক্যামেরা পারফর্ম্যান্সের ওপর।

আলাদা কোনো গিম্বল ক্যামেরার তুলনায় স্মার্টফোনের মতো বড় স্ক্রিনে সেটিংস বা শুটিং মোড পরিবর্তন করতে পারাটা সত্যিই দারুণ স্বস্তির—ছোট স্ক্রিনে বারবার আঙুল দিয়ে গুঁতো দেওয়া বা একগুচ্ছ বাটন চেপে রাখার ঝামেলো এখানে নেই। অনার এতে বেশ কিছু AI-চালিত শুটিং মোড যুক্ত করেছে, যার মধ্যে আপাতত সবচেয়ে নজরকাড়া ছিল গিম্বল ক্যামেরা দিয়ে ১৮০-ডিগ্রির স্পিন শট বা ঘোরানো ভিডিও।
এছাড়া এতে রয়েছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্ট্যাবিলাইজিং ‘সুপার-স্টিডি মোড‘। লন্ডনের কিংস ক্রস স্টেশনে লাফিয়ে লাফিয়ে চলার পরও এটি ভিডিও ফুটেজকে চমৎকারভাবে একদম স্থির রেখেছিল। তবে এটি ব্যবহারে কিছুটা অভ্যস্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে; কারণ মাঝেমধ্যে আমি যা চাইনি, সেই পথচারীদের মুখের ওপরও রোবট ফোনটি অটো-ফোকাস লক করে ফেলছিল। তবে ফোনটি কীভাবে সাবজেক্ট ট্র্যাকিংকে প্রাধান্য দেয়, তা আমি দ্রুতই ধরে ফেলেছিলাম। এছাড়া ফোন লম্বালম্বি (ভার্টিক্যালি) ধরে রেখে আড়াআড়ি (হরাইজন্টাল) ভিডিও শুট করতে পারাও বেশ আরামদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল।
যেহেতু এতে বিল্ট-ইন গিম্বল রয়েছে, তাই ভিডিও রেকর্ডিংই এই রোবট ফোনের মূল আকর্ষণ। আর সে কারণে অনার তাদের UI, LUTs এবং অন্যান্য বিষয়ের জন্য বিখ্যাত সিনেম্যাটিক ক্যামেরা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ARRI-এর সাথে অংশীদারিত্ব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজ এডিটিংয়ের সুবিধার্থে ARRI-এর LogC3 ফরম্যাটে ভিডিও শুটের সুবিধা। আপনি ভিডিও করার সময় প্রিভিউতেই বিভিন্ন LUTs প্রয়োগ করে দেখে নিতে পারবেন ভিডিওটি কেমন দেখাবে, যার ফলে চূড়ান্ত ভিডিওর লুক নিয়ে পরে সমস্যায় পড়তে হবে না। রোবট ফোনটি দিয়ে অল্প কিছু সময় শুটিং করার পর আমার যা মনে হয়েছে—এর শুটিং অভিজ্ঞতার অবস্থান ঠিক একটি সাধারণ ফোন এবং একটি গিম্বলের মাঝামাঝি।
তবে এটি বেশিরভাগ সময় একটি আসল গিম্বলের মতোই আচরণ করে এবং কাজ করে। অন-স্ক্রিন জয়স্টিক ব্যবহার করে আপনি গিম্বলের ট্র্যাকিং স্পিড এবং ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ম্যানুয়ালি অ্যাডজাস্ট বা পরিবর্তন করতে পারবেন। সুবিধাজনক বিষয় হলো, এই ফোনটি মানুষ এবং যেকোনো বস্তু—উভয়কেই ট্র্যাক করতে পারে, যা প্রচলিত কিছু স্মার্ট গিম্বলের চেয়েও ভালো।
প্রযুক্তিটি সত্যিই দেখার মতো; গিম্বল আর্মটি এত ছোট হওয়ায় ভেবেছিলাম এর স্ট্যাবিলাইজেশন হয়তো কিছুটা দুর্বল হবে, কিন্তু আমি লাফিয়ে চলার পরও এটি দারুণভাবে সামলে নিয়েছে এবং সুপার-স্টিডি শটটি প্রয়োজন অনুযায়ী চমৎকার কাজ করেছে। তবে স্যামসাংয়ের Galaxy Z TriFold-এর মতোই, এই রোবট ফোনটিও মূলত একটি ‘কনসেপ্ট’ প্রমাণের চেষ্টা এবং আর্লি-অ্যাডাপ্টারদের জন্য একটি ব্যয়বহুল পরীক্ষা। চীনে এর রিটেইল প্রাইস ৯,৯৯৯ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১,৭০,০০০ টাকার মতো (বা প্রায় ১,৫০০ ইউএস ডলার)।
তবে এশিয়া মহাদেশের বাইরে ইউকে (UK) বা অন্যান্য দেশে অনারের ফোনগুলোর দাম সাধারণত আরও বেশি হয়ে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের ফোল্ডেবল ফোন Magic V6 চীনে এই রোবট ফোনের চেয়েও কম দামে লঞ্চ হয়েছিল। কিন্তু ইউকে-তে সেই Magic V6-এর দাম রাখা হয়েছে ২,০০০ পাউন্ড (যা ২,৭০০ ডলারের বেশি)। রোবট ফোনটি যদি পশ্চিমে লঞ্চ হতো, তবে এর দাম নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি হতো। আলাদাভাবে একটি স্ট্যান্ডঅ্যালোন গিম্বল ক্যামেরা এবং একটি ফ্ল্যাগশিপ ফোন কেনার তুলনায় এটি সত্যিই একটি ভীষণ ব্যয়বহুল পরীক্ষা।
রোবট ফোনটি সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহারের উপযোগী হলেও অনার এখনো সাধারণ বাজারে এটি ছাড়ার ব্যাপারে বেশ সতর্ক। আপাতত আপনাকে চীন থেকে এটি অর্ডার করতে হবে (অথবা ইম্পোর্ট করতে হবে)। তবে চীন থেকেও এটি জোগাড় করা কঠিন হতে পারে, কারণ অনার নিশ্চিত করতে চায় যেন তারা শুরুর দিকের চাহিদাটুকু অন্তত পূরণ করতে পারে।
ভারী মূল্যের পাশাপাশি এর স্থায়িত্ব বা ডিউরেবিলিটি নিয়েও চিন্তা থেকে যায়। কোনো ডিভাইসে যখন অতিরিক্ত যান্ত্রিক বা মুভিং পার্টস থাকে, তখন সেগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা বেড়ে যায়। তাছাড়া, রোবট ফোনটিতে IP54 ধুলো ও পানি প্রতিরোধক ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তা কেবল তখনই কাজ করবে যখন গিম্বলটি ভেতরের প্রকোষ্ঠে গুটিয়ে রাখা থাকবে—যদিও এটি ভেতরের রোবোটিক পার্টসগুলোর স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
আপনি যদি এটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তবে অনারের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে কোম্পানিটি ইতোমধ্যেই চীনের বাইরে লঞ্চ করা যায় এমন ভবিষ্যৎ ডিভাইস নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। তারা পরবর্তীতে এর কেমন সিক্যুয়েল বা দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে আসে, তা দেখতে আমি সত্যিই বেশ আগ্রহী। কোম্পানিটি যদি স্মার্টফোনের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ডিভাইসের দিকে মনোযোগ দিতে চায়—যা দেখে মনে হচ্ছে তারা করছেও—তবে হয়তো এই অতি ক্ষুদ্র গিম্বলটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র ডিভাইস হিসেবে বাজারে আসতে পারে: একটি ছোট পকেট-সাইজ গিম্বল ক্যামেরা যা অনায়াসেই আপনার পকেটে এঁটে যাবে।
সূত্র: Engadget
মূল তথ্য যাচাই: Google Android / Google Wallet
